মূল্যস্ফীতি বনাম প্রবৃদ্ধি

ঋণের সুদহার নিয়ে দোটানায় ইউরোপ

একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে দুর্বল প্রবৃদ্ধি মোকাবেলা এ নিয়ে সংকটে পড়েছে ইউরোপের অর্থনীতিগুলো।

একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে দুর্বল প্রবৃদ্ধি মোকাবেলা এ নিয়ে সংকটে পড়েছে ইউরোপের অর্থনীতিগুলো। প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহার নীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দোটানায় পড়েছে এ অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। ইউরোজোন বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার বাড়া সত্ত্বেও সুদহার কমানো নিয়ে একমত হতে পেরেছে। যদিও জোটভুক্ত অর্থনীতিগুলোর কোনো কোনোটি এক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। একই ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসা যুক্তরাজ্যেও। খবর রয়টার্স, গার্ডিয়ান।

মূল্যস্ফীতির ফিরে আসার শঙ্কায় সুদহার স্থিতিশীল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। তবে প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ায় এক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি)। গত বুধবার এক বৈঠকে ইসিবি প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে ও নীতিনির্ধারণী কাউন্সিলের সদস্য ফ্রাঁসোয়া ভিলেরোয়া দে গালহা, ক্লাস নট ও ইয়ানিস স্টুরনারাস সবাই নীতি শিথিলের পক্ষে মত দেন। তবে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেন লুই ইসক্রিভা।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বরে ইউরো অঞ্চলের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি হার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে ইইউর বার্ষিক মূল্যস্ফীতি হার ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বাড়া সত্ত্বেও সুদহার কমাতে যাচ্ছে ইসিবি।

ইসিবি এরই মধ্যে দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলায় চারবার সুদহার কমিয়েছে। চলতি বছরও এ নীতি অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ না করায় ব্যবসায়ীরা সুদহার কমানোর পূর্বাভাস আরো বাড়িয়েছেন।

ইসিবি প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে জানান, সুদহার কমানোর ব্যাপারে ইসিবির অবস্থান স্পষ্ট। কিন্তু কখন ও কী পরিমাণে তা কমানো হবে, তা নির্ভর করছে অথনৈতিক প্রতিবেদনগুলোর ওপর। এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের তুলনায় সতকর্তার সঙ্গে পদক্ষেপ নেয়াই বাঞ্ছনীয়।

তিনি বলেন, ইসিবির ২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা নেই। তবে ইউরোর বিনিময় হার কমার প্রভাবের দিকে নজর দিতে হবে।

৩০ জানুয়ারি ও আগামী ৬ মার্চ সুদহার কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত বলে মন্তব্য করেন ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ক্লাস নট। তিনি বলেন, ‘দুটি আসন্ন বৈঠক নিয়ে বাজারের প্রত্যাশার বিষয়ে আমি বেশ আত্মবিশ্বাসী। তবে এর চেয়ে বেশি মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি।’

মধ্য থেকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কথাও স্বীকার করেন ক্লাস নট। তিনি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি কতটা ফিরে আসছে, তার ওপর অর্থনীতির আগামী দিনের গতি নির্ভর করছে।

এদিকে অর্থমন্ত্রী র‌্যাচেল রিভসের শরৎকালীন বাজেটের পর যুক্তরাজ্যে কর্মসংস্থানে সৃষ্টি গত চার বছরে সবচেয়ে দ্রুত হারে কমে গেছে। এর মধ্যে দেশটির মূল্যস্ফীতি বাড়ার লক্ষণও স্পষ্ট হচ্ছে। এতে সুদহার কমানো নিয়ে জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই)।

আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি সুদহার ঠিক করতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ বৈঠককে সামনে রেখে দেশটিতে পণ্য ও সেবা খাতের দাম বাড়ার তথ্য সামনে এসেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের জানুয়ারির ফ্ল্যাশ পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বেসরকারি খাতের ব্যবসাগুলো পণ্য ও সেবার দাম ১৮ মাসের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হারে বেড়েছে। কভিড-১৯ মহামারীর সময়ের পর চলতি মাসে নিয়োগকর্তারা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কর্মী ছাঁটাই করেছেন। মহামারীকালীন সংকট বাদ দিলে এ হার ২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সর্বোচ্চ।

যদিও অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শুরুতে ব্রিটেনের প্রধান সেবা খাতের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে।

ক্রিসমাস উপলক্ষে খুচরা বিক্রি বাড়ার আশা করা হলেও বাস্তবে তা ঘটেনি। আলাদা এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে খুচরা বিক্রি কমে গেছে এবং ভোক্তা আস্থা ২০২৩ সালের শেষের দিকের পর থেকে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গেছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের প্রধান ব্যবসায়িক অর্থনীতিবিদ ক্রিস উইলিয়ামসন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ছে, যা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের জন্য একটি বড় নীতিগত সংকট তৈরি করছে। দেশটিতে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত। একটি সমাধান করতে নেয়া পদক্ষেপ অন্য সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। যুক্তরাজ্য এমন একটি চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরও